4:04 am, Saturday, 13 December 2025

রাজনগর উপজেলা প্রশাসনে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ: তদন্ত দাবি স্থানীয়দের

হোসাইন আহমদ, মৌলভীবাজার | ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ — মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন তহবিল থেকে ভুয়া বিল–ভাউচার, স্বাক্ষর জালিয়াতি ও তথ্য গোপনের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
প্রাথমিক কাগজপত্র পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি—গত পাঁচ মাসে উপজেলা প্রশাসনের সাধারণ, রাজস্ব ও উন্নয়ন তহবিল মিলিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।

এই অভিযোগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজা হাবিব শাপলা, সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর অনুপ চন্দ্র দাশ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. বাদশা মিয়াসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। তবে অভিযোগে অভিযুক্তদের একজন এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছেন, অন্যজন দাবি করেছেন তিনি প্রতারণার শিকার।

অভিযোগ: ভুয়া বিল–ভাউচার ও ব্যক্তিগত হিসাবে অর্থ স্থানান্তর

দায়িত্বশীল একটি প্রশাসনিক সূত্র জানায়, উপজেলা সাধারণ তহবিল থেকে ৮০ লাখ ৫১ হাজার ৪৫৫ টাকা, রাজস্ব তহবিল থেকে ৪০ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন তহবিল থেকে ৩১ লাখ টাকা অনিয়মের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়।

সূত্র ও নথিপত্র বিশ্লেষণে জানা যায়—

  • টেংরাবাজার পশুহাটের জামানতের ৫ লাখ টাকা ক্যাশ রেজিস্টারে দেখানো হলেও উপজেলা অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি।
  • বিভিন্ন সময়ে হাট ইজারা সম্পর্কিত আয়কর, ভ্যাট, প্রচার ব্যয় ইত্যাদি বাবদ ইস্যু করা চেকের প্রকৃত অঙ্ক নথিপত্রের সঙ্গে মিলেনি।
  • সংশ্লিষ্ট চেকগুলোর একটি বড় অংশ সোনালী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংকসহ বিভিন্ন শাখায় ব্যক্তিগত হিসাব নম্বরে স্থানান্তর করা হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য কিছু অমিলের মধ্যে রয়েছে—

  • ১৫% ভ্যাট বাবদ ১৫,০৩২ টাকার স্থলে ৫,১৫,০৩২ টাকা ট্রান্সফার।
  • প্রচার ব্যয় বাবদ ২৫,০০০ টাকার স্থলে ২,২৫,০০০ টাকার উত্তোলন।
  • একাধিক চেকে প্রকৃত অঙ্কের সঙ্গে মিল না থাকা এবং নোটশিটের পাতা ছেঁড়া থাকার অভিযোগ।

একাধিক ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে অনুপ চন্দ্র দাশের ব্যক্তিগত হিসাব নম্বর বারবার ব্যবহৃত হয়েছে বলে ব্যাংক স্টেটমেন্ট সূত্রে জানা যায়।

অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাদশা মিয়া

তিনি দাবি করেন—

“আমি হিসাব সংক্রান্ত নথিতে স্বাক্ষর করেছি। আমার বা ইউএনও মহোদয়ের স্বাক্ষর নিয়ে অনুপ এভাবে জালিয়াতি করবে বুঝতে পারিনি।”

অনুপ চন্দ্র দাশের স্ত্রীর দাবি

আত্মগোপনে থাকা অনুপের স্ত্রী ঝুমি রানী সরকার জানান—

“৭১ লাখ টাকা ইতোমধ্যে ফেরত দেওয়া হয়েছে। বাসা বেচে টাকা জোগাড় করেছি।”
তিনি আরও দাবি করেন—
“এ অনিয়ম এককভাবে হয়নি। সেই সময়কার স্টাফরাও অংশ নেবেন বলে প্রস্তাব এসেছে, এবং ইউএনও ম্যাডামের সঙ্গেও আমাদের যোগাযোগ হয়েছে।”

এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সদ্য বিদায়ী ইউএনও আফরোজা হাবিব শাপলা

অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন—

“এ অনিয়মে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। অনুপ আমার স্বাক্ষর নিয়ে পরে অতিরিক্ত অঙ্ক বসিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন—
“বিভিন্ন ব্যক্তির নামে এত টাকা গেল, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একবারও আমাকে ফোন করেনি।”

তবে এ বিষয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতামত বিপরীত।
সোনালী ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপকরা বলেন—

“ট্রান্সফার নিয়ম মেনেই হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন আমাদের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করেনি।”

একপর্যায়ে এক ব্যবস্থাপক সাংবাদিককে বলেন—

“ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা যায় না।”

বর্তমান ইউএনও ফাতেমা তুজ জোহরা

তিনি সংক্ষেপে জানান—

“বিষয়টি তদন্তাধীন। এখনই মন্তব্য করা যাচ্ছে না।”

এর আগে অনিয়মের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর আগেও নার্সারি মালিকদের ৫ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের পর ইউএনও আফরোজা হাবিব শাপলা টাকা ফেরত দিয়েছিলেন।
তবে বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে দাবি করেছে কয়েকটি সূত্র।

স্থানীয়দের দাবি: স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ—পাঁচ মাসে বিপুল অঙ্কের এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম প্রশাসনের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করেছে।
তারা একটি স্বাধীন ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি, ব্যাংকিং লেনদেন যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

অবস্থা এখন কোথায় দাঁড়িয়েছে?

প্রাপ্ত সব তথ্য বর্তমানে জেলা প্রশাসনের নজরে আছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্র নিশ্চিত করেছে।
তবে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসন আনুষ্ঠানিক মন্তব্য দিতে রাজি হয়নি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

রাজনগর উপজেলা প্রশাসনে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ: তদন্ত দাবি স্থানীয়দের

Update Time : 06:55:41 pm, Tuesday, 2 December 2025

হোসাইন আহমদ, মৌলভীবাজার | ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ — মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন তহবিল থেকে ভুয়া বিল–ভাউচার, স্বাক্ষর জালিয়াতি ও তথ্য গোপনের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
প্রাথমিক কাগজপত্র পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি—গত পাঁচ মাসে উপজেলা প্রশাসনের সাধারণ, রাজস্ব ও উন্নয়ন তহবিল মিলিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।

এই অভিযোগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজা হাবিব শাপলা, সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর অনুপ চন্দ্র দাশ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. বাদশা মিয়াসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। তবে অভিযোগে অভিযুক্তদের একজন এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছেন, অন্যজন দাবি করেছেন তিনি প্রতারণার শিকার।

অভিযোগ: ভুয়া বিল–ভাউচার ও ব্যক্তিগত হিসাবে অর্থ স্থানান্তর

দায়িত্বশীল একটি প্রশাসনিক সূত্র জানায়, উপজেলা সাধারণ তহবিল থেকে ৮০ লাখ ৫১ হাজার ৪৫৫ টাকা, রাজস্ব তহবিল থেকে ৪০ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন তহবিল থেকে ৩১ লাখ টাকা অনিয়মের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়।

সূত্র ও নথিপত্র বিশ্লেষণে জানা যায়—

  • টেংরাবাজার পশুহাটের জামানতের ৫ লাখ টাকা ক্যাশ রেজিস্টারে দেখানো হলেও উপজেলা অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি।
  • বিভিন্ন সময়ে হাট ইজারা সম্পর্কিত আয়কর, ভ্যাট, প্রচার ব্যয় ইত্যাদি বাবদ ইস্যু করা চেকের প্রকৃত অঙ্ক নথিপত্রের সঙ্গে মিলেনি।
  • সংশ্লিষ্ট চেকগুলোর একটি বড় অংশ সোনালী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংকসহ বিভিন্ন শাখায় ব্যক্তিগত হিসাব নম্বরে স্থানান্তর করা হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য কিছু অমিলের মধ্যে রয়েছে—

  • ১৫% ভ্যাট বাবদ ১৫,০৩২ টাকার স্থলে ৫,১৫,০৩২ টাকা ট্রান্সফার।
  • প্রচার ব্যয় বাবদ ২৫,০০০ টাকার স্থলে ২,২৫,০০০ টাকার উত্তোলন।
  • একাধিক চেকে প্রকৃত অঙ্কের সঙ্গে মিল না থাকা এবং নোটশিটের পাতা ছেঁড়া থাকার অভিযোগ।

একাধিক ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে অনুপ চন্দ্র দাশের ব্যক্তিগত হিসাব নম্বর বারবার ব্যবহৃত হয়েছে বলে ব্যাংক স্টেটমেন্ট সূত্রে জানা যায়।

অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাদশা মিয়া

তিনি দাবি করেন—

“আমি হিসাব সংক্রান্ত নথিতে স্বাক্ষর করেছি। আমার বা ইউএনও মহোদয়ের স্বাক্ষর নিয়ে অনুপ এভাবে জালিয়াতি করবে বুঝতে পারিনি।”

অনুপ চন্দ্র দাশের স্ত্রীর দাবি

আত্মগোপনে থাকা অনুপের স্ত্রী ঝুমি রানী সরকার জানান—

“৭১ লাখ টাকা ইতোমধ্যে ফেরত দেওয়া হয়েছে। বাসা বেচে টাকা জোগাড় করেছি।”
তিনি আরও দাবি করেন—
“এ অনিয়ম এককভাবে হয়নি। সেই সময়কার স্টাফরাও অংশ নেবেন বলে প্রস্তাব এসেছে, এবং ইউএনও ম্যাডামের সঙ্গেও আমাদের যোগাযোগ হয়েছে।”

এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সদ্য বিদায়ী ইউএনও আফরোজা হাবিব শাপলা

অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন—

“এ অনিয়মে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। অনুপ আমার স্বাক্ষর নিয়ে পরে অতিরিক্ত অঙ্ক বসিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন—
“বিভিন্ন ব্যক্তির নামে এত টাকা গেল, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একবারও আমাকে ফোন করেনি।”

তবে এ বিষয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতামত বিপরীত।
সোনালী ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপকরা বলেন—

“ট্রান্সফার নিয়ম মেনেই হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন আমাদের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করেনি।”

একপর্যায়ে এক ব্যবস্থাপক সাংবাদিককে বলেন—

“ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা যায় না।”

বর্তমান ইউএনও ফাতেমা তুজ জোহরা

তিনি সংক্ষেপে জানান—

“বিষয়টি তদন্তাধীন। এখনই মন্তব্য করা যাচ্ছে না।”

এর আগে অনিয়মের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর আগেও নার্সারি মালিকদের ৫ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের পর ইউএনও আফরোজা হাবিব শাপলা টাকা ফেরত দিয়েছিলেন।
তবে বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে দাবি করেছে কয়েকটি সূত্র।

স্থানীয়দের দাবি: স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ—পাঁচ মাসে বিপুল অঙ্কের এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম প্রশাসনের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করেছে।
তারা একটি স্বাধীন ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি, ব্যাংকিং লেনদেন যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

অবস্থা এখন কোথায় দাঁড়িয়েছে?

প্রাপ্ত সব তথ্য বর্তমানে জেলা প্রশাসনের নজরে আছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্র নিশ্চিত করেছে।
তবে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসন আনুষ্ঠানিক মন্তব্য দিতে রাজি হয়নি।